Sunday, 1 September 2019

গবেষণা ও চিন্তাচর্চায় আল কোরআনের অনুপ্রেরণা সাজ্জাদ আকবর ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৭:২০ | অনলাইন সংস্করণ

গবেষণা ও চিন্তাচর্চায় আল কোরআনের অনুপ্রেরণা

  সাজ্জাদ আকবর ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৭:২০ | অনলাইন সংস্করণ


আল কোরআন।
ছবি: সংগৃহীত
‘তারা কি ভূপৃষ্ঠে ভ্রমণ করে না, যাতে তারা জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন হৃদয় ও শ্রুতিসম্পন্ন শ্রবণের অধিকারী হতে পারে! বস্তুত চক্ষু তো অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হচ্ছে তাদের হৃদয়।’ (সূরা হজ : ৪৬)
‘তবে কি তারা লক্ষ্য করে না উটের প্রতি, কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আকাশের প্রতি, কীভাবে তাকে উঁচু করা হয়েছে এবং পাহাড়সমূহের প্রতি, কীভাবে তাকে প্রথিত করা হয়েছে এবং ভূমির প্রতি, কীভাবে তা বিছানো হয়েছে’। (সূরা গাশিয়া ১৭-২০)
এভাবেই আল কোরআনে গবেষণা ও চিন্তার চর্চার কথা বলা হয়েছে। ভাবনা, উপলব্ধি ও ইন্দ্রিয়শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সৃষ্টির রহস্য উদঘাটনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘সৃষ্টি নিয়ে এক ঘণ্টা গবেষণা করা বছরের পর বছর ইবাদত করার চেয়ে বেশি মূল্যবান।’
পবিত্র কোরআনে ১০০ এরও বেশি আয়াতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে তারা যেন চিন্তা-ভাবনা করে, শোনে,মনোযোগ দেয়,তুলনা করে বা পরিমাপ করে,ভাবে,বুদ্ধি ও বিবেকের চর্চা করে এবং বিচার-বিবেচনা করে। সর্বোপরি মেধাকে যেন কাজে লাগায়।
বহু আয়াতের শেষাংশে এভাবে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে: তোমরা কি চিন্তা করে দেখছো না? তোমরা কি তোমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি একটুও কাজে লাগাও না? তারা কি কোরআন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে না?
তবে এভাবে জিজ্ঞাসা করার পাশাপাশি বহু জায়গায় বিশ্বের বিচিত্র অজানা রহস্য নিয়ে ভাবতে, গবেষণা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি যারা চিন্তাশক্তি, মেধা ও মননকে কাজে লাগায় না তাদের অন্ধ, বধির এমনকি চতুষ্পদ জন্তু কিংবা তাদের চেয়েও নিকৃষ্ট বলে তিরস্কার করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনের সূরা আরাফের ১৭৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: ‘আর এটি একটি অকাট্য সত্য যে,বহু জিন ও মানুষ এমন আছে যাদের আমি জাহান্নামের জন্যই সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না। তাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা পশুর মতো বরং তাদের চেয়েও অধম। তারা চরম গাফলতির মধ্যে হারিয়ে গেছে।’
এতকিছুর পরও যারা বিবেক-বুদ্ধি,মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে কোনো বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না,তাদের অকর্মণ্য, উপলব্ধিহীন, অসচেতন প্রাণী বলে তিরস্কার করেছে।
সূরা আনফালে বলা হয়েছে: ‘আর তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না,যারা বলে যে, আমরা শুনেছি,অথচ তারা শোনে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলার নিকট সমস্ত প্রাণীর তুলনায় তারাই মূক ও বধির,যারা উপলব্ধি করে না।’(সূরা আনফাল : ২১, ২২)
কোরআনের নির্দেশনা অমান্য করে যারা চিন্তারিক্ত হয়ে বসে থাকে, যারা নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে সৃষ্টি ও স্রষ্টার হাকিকত উপলব্ধি করার চেষ্টা করে না, কোরআন তাদের মনুষ্যত্বের মর্যাদা থেকেও বঞ্চিত করেছে। কারণ, মনুষ্যত্ব ও পশুত্বের পার্থক্যরেখা যে চিন্তাশক্তি তা না থাকলে মানবীয় মর্যাদাই তো বিলীন হয়ে যায়।
এ জন্য কোরআন মানুষের চিন্তাশক্তির প্রতিবন্ধক বিষয়গুলোও নিষিদ্ধ করেছে। পূর্বসূরিদের অন্ধ অনুসরণ, গোঁড়ামি, কূপমণ্ডুকতা পরিহার করে ইসলামের উদার চিন্তা দর্শনের চর্চা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মানুষ জ্ঞান-গবেষণা, চিন্তা-ভাবনা, নতুন নতুন উদ্ভাবনী শক্তি ছাড়া একঘেঁয়ে হয়ে যায়। জীবনে তাদের কোনোরকম উন্নতি কিংবা পরিবর্তন আসে না। আর এই পরিস্থিতিতে অপরাপর সৃষ্টির সঙ্গে মানুষকে আলাদা ভাববার সুযোগ থাকে না।
অতএব মানুষের সঙ্গে অন্যান্য সৃষ্টির পার্থক্য হল, বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনা এবং উদ্ভাবনী শক্তির মধ্যে। মানুষ নতুন নতুন সৃষ্টি করতে পারঙ্গম। আর এই উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগানোর প্রণোদনা দেয়া হয়েছে হাদীসে। এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলে আকরাম (সা.) চেষ্টা করতেন পথচলার ক্ষেত্রে যে রাস্তা দিয়ে একবার গেছেন বিকল্প থাকলে সেই রাস্তায় না যেতে।
এর মানে হল মানুষের উচিত প্রতিদিনই নতুন নতুন পথের সন্ধান করা। একই পথ নিয়ে পড়ে না থাকা। দুটি পথ থাকলে তৃতীয় পথ কী করে তৈরি করা যায় তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। এই চিন্তাকে জাগানোর জন্যই বারবার আহ্বান করেছে কোরআন।
যারা বিবেকশাসিত চিন্তা করে, আর যারা করে না, যারা জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ভাবতে পারার ইতিবাচক পথকে অবলম্বন করে আর যারা করে না, যারা প্রজ্ঞা ও বিবেককে ব্যবহার করে আর যারা করে না, তাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলছেন :‘বল, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান? (সূরা : আনআম : ৫০ )
যারা সত্যের জন্য বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগায় না, কোনোরূপ চিন্তা করে না, গবেষণা করে না তাদের কোরআনে মূক, বধির, অন্ধ ইত্যাদি অভিধায় তিরস্কৃত করা হয়েছে। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'তারা কি কোরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না, নাকি তাদের অন্তর তালাবদ্ধ? (সূরা মুহাম্মদ : ২৪)
যুক্তি, বুদ্ধি ও বিবেচনাবোধের প্রতি ইসলাম দিয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। দিয়েছে যথাযথ মর্যাদা। কোরআনের বহু আয়াতে আছে এর বর্ণনা। পবিত্র কালামে পাকের অমোঘ ঘোষণা- ‘নিশ্চয়ই মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টিতে এবং দিবা-রাত্রির আবর্তনের মধ্যে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং মহাকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করে এবং বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! এ সবকিছু তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সব পবিত্রতা একমাত্র তোমারই। আমাদের তুমি দোজখের শাস্তি হতে বাঁচাও। (সূরা আল-ইমরান ১৯০-৯১)
আয়াতে কারীমা স্পষ্ট করছে, সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণ ও সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা ও গবেষণার কারণেই অন্যান্য সৃষ্টির ওপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। অতএব মহাগ্রন্থ আল কোরআন চিন্তা ও গবেষণায় বিবেকবোধকে কার্যকর করার পয়গাম দিয়েছে। অনুভব ও উপলব্ধিকে কাজে লাগাতে বলেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে নবী! বলে দাও, আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, তার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করো।’ (সূরা ইউনুস, আয়াত ১০১)
প্রকৃতি নিয়ে, সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে, মহাজাগতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভেবে না দেখাকে আল্লাহ তায়ালা তিরস্কার করেছেন। কোরআনের ঘোষণা- 'তারা কি নিজেদের অন্তরে ভেবে দেখে না, আল্লাহ আসমান ও জমিন এবং এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুই যথাযথভাবে ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছেন। (সূরা রুম, আয়াত ৮)
তাই গবেষণা ও চিন্তাচর্চা ছাড়া ইহ বা পরকাল কোথাও সফলতার আশা করা যায় না। চিন্তার মুক্তি মানুষের সফলতার প্রধান অবলম্বন। গবেষণা ও চিন্তাশীলতা ছাড়া পৃথিবীর কোনো জাতি সমৃদ্ধ হতে পারেনি। চিন্তাগবেষণার কল্যাণে পৃথিবী আজ এতদূর অগ্রসর হতে পেরেছে। ইহলৌকিক পারলৌকিক সব দৃষ্টিতেই চিন্তাচর্চার বিকল্প নেই।
লেখক: অধ্যয়নরত, ইন্সটিটিউট অব ইসলামিক থট অ্যান্ড রিসার্চ, ঢাকা

No comments:

Post a Comment

Chowdhury,s

digital marketing: Potential of mineral along the bay of bengal, Bang...

digital marketing: Potential of mineral along the bay of bengal, Bang... :   By Iftekhar Uddin Chowdhury w www.linkedin.com/in/iftekharchowd...